উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বাস্তুতন্ত্র

বাস্তুতন্ত্র


বাস্তুতন্ত্র 

আহাদ আদনান


বন্যার জল আর আটকানো গেলো না। প্রতিবারই বাড়ির সামনের মাঠটা ডুবে যায়। এবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে জ্যৈষ্ঠ থেকে। উপোষী মাঠটা আষাঢ়ের গোড়াতেই টুইটুম্বুর। কাচপুরের পাশের খালটা বেয়ে জল চলে যায় শীতলক্ষ্যায়। গত শীতেই যখন ড্রেজার দিয়ে খাল ভরাট হচ্ছিল তখনই কুসুম তার স্বামী আয়নালকে বলেছিল, ‘এইবার বর্ষা আইলে ঘরে পানি ঢুকব, দেইখো তুমি। পানি নামার রাস্তা দিতাছে বন্ধ কইরা। ঘর পাল্টাইবা নাকি এইবার’?

‘এত কম খরচে ঘর পাবি কই তুই? সপ্তাখানেক ইট দিয়া ঠ্যাক দিলেই চলব’।

ঘরটা আসলেই সস্তা এই বাজারে। যাত্রামুড়ার মহাসড়কের ডান পাশ দিয়ে গেছে ছোট গলির মত এক রাস্তা। এটা মিলবে ভুলতার বড় রাস্তার সাথে। রাস্তার দুই পাশে খোলা মাঠ, ধানের জমি। আরেকটু এগুলেই ময়লার ভাগাড়। রাজধানীর বাড়িতে বাড়িতে জমে থাকা আবর্জনা প্রতিদিন নিয়ে আসে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িগুলো। ফেলে দিয়ে যায় এই খোলা আকাশের নিচে। পচে পচে এরা দুর্গন্ধ ছড়ায়। বংশবিস্তার করে অতি উর্বর জীবাণুর দল। মাছি এসে পাখায়, পায়ে করে এই দূষিত কণা পৌঁছে দেয় বাসনে বাসনে। এই আবর্জনা যেন স্বাদ বাড়িয়ে দেয় পথের ধারের খুপরি দোকানগুলোর পুড়ি, চপ, চটপটি, ফুচকার। ছেলেদের দল হাঁক দেয়, ‘মামা, ফুচকার লগে টক মারো বেশি কইরা’। 

আলতাফ চৌধুরী থাকেন তারাবোতে। প্রধান সড়কের পাশেই তার পাঁচতলা বাড়ি। কয়েক বিঘা ধানের খেত আছে এই মাঠের সাথেই। এর মাঝেই একটা একতলা ঘর বানিয়ে রেখেছেন। শরিকের জমি। গ-গোল লেগেই থাকে। বাড়িটা তাই এক ধরণের জমি দখলই বলা যায়। দুইটা থাকার ঘর, একটা রান্না ঘর আর একটা টয়লেট। পূব দিকের ঘরে থাকে বজলু। এক ছেলে আর বউ নিয়ে তিন জনের সংসার। বরপা’তে একটা ‘বাংলার তাজমহল’ তৈরি হয়েছে, তার পাশেই একটা চায়ের দোকান তার। আর পশ্চিম দিকের ঘরটা আয়নালের। পরিবারের সদস্য একজন বেশি, কিন্তু আয় কম। সুদের টাকায় একটা অটো-বাইক কিনে সে এই পথেই চালায়। কিস্তির টাকা দিয়ে হাতে থাকে সামান্যই। পাঁচ মাসের বাচ্চাটা রেখে তার বউ কুসুম ছুটা বুয়ার কাজ নিয়েছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যাত্রামুড়া তিনটা ফ্ল্যাটে কাপড় কাঁচা আর ঘর মুছা। বড় মেয়েটার বয়স এগারো বছর। ছোট বোনকে সে দেখে রাখে ভালো মতোই। করোনার জন্য স্কুল বন্ধ। সারাদিন কাটে তার বোনের সাথে খেলা করে। 

বোনটা খুব ঠা-া মিষ্টি’র। মীনা কার্টুন দেখে আর নিজের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রেখে দিয়েছে মিঠু। মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘কও, মিঠু। আমার নাম মিঠু’। মিঠু অবশ্য শুনে কিনা এটা নিয়ে সন্দেহ আছে যথেষ্টই। বাড়িতে ডেলিভারি করতে গিয়ে আটকে ছিল অনেকক্ষণ। জন্মের পর কান্না করেছে অনেক দেরিতে। খিঁচুনি হয়ে মরতে বসেছিল বাচ্চাটা। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বেঁচে গেলেও সারা জীবনের জন্য পিছিয়ে পড়েছে পাঁচ মাসের মিঠু। এখনও তার ঘাড় শক্ত হয়নি। মুখ দিয়ে কোন শব্দও করেনা। আয়নাল তিনটা মাজার থেকে তাবিজ এনে বেঁধে দিয়েছে গলায়, বাহুতে আর কোমরে। ফলাফল লবডঙ্কা। 

আষাঢ়ের মাঝামাঝি। বৃষ্টি হচ্ছে বিকেল থেকে। বজলু ডাক দেয় আয়নালকে।

‘আয়নাল ভাই, এই পুরা বাড়ি তোমারে দিয়া দিলাম। এক তারিখেই আমি ঘর ছারুম। আর পোষাইতাছে না’।

‘ক্যান, কী অইছে? যাইবেন কই’?

‘দোকান বন্ধ হইতে হইতে মাঝ রাইত হয়া যায়। কাছাকাছি একটা বাসা নিছি। এই বাড়িতে মানুষ থাকে? জন-মানব নাই, দোকান-পাট নাই। সারাদিন গুয়ের গন্ধ আর মাক্ষি ঘুরঘুর করে। কোনদিন রাইতে চোর নাইলে ডাকাত আইয়া ল্যাংটা কইরা ফালায়া রাখব। আষাঢ় শেষ না হইতেই সিঁড়িতে পানি আইছে। এইবার ঘর ডুইবা যাইবই। ঘরে পানি হান্দাইলে যাইবা কই মিয়া’?

‘কথা ঠিকই কইছেন। তা আপনার আয় রোজগার মাশাল্লাহ ভালা। আমি এই বেজন্মা কিস্তির ফান্দে পইড়া গেছি। পানি উঠলে ইট দিতে হইব। কয়টা দিনের ব্যাপার’।

বিপদ এবার সব দিক থেকেই আসলো। করোনার জন্য আয় কমে গেছে আগে থেকেই, সাথে যোগ হয়েছে বন্যা। আষাঢ়ের শেষের দিকে ঘরে জল ঢুকে পড়ে। ইট দিয়ে খাট, টেবিল আর ওয়োরড্রৌব উঁচু করে দিয়েছিল আয়নাল। প্রথমে দুটো করে ইট। তারপর চারটা করে। রাতের আঁধারে তারাবো ইটের খোলা থেকে সে চুরি করে আনত ইট। শ্রাবণের বারো তারিখে স্বপরিবারে আয়নাল বাসা বাঁধে বাড়ির ছাদে।

চৌধুরীর কাছে গিয়েছিল আয়নাল। একটা নৌকা, মই আর ত্রিপলের জন্য। শুধু একটা মই দিয়ে দূরদূর করে তাকে বিদেয় করেছে চৌধুরী। নদীর মাঝখানে চরের মত জেগে থাকে বাড়ির ছাদটা। ত্রিপল জোগাড় করতে না পেরে সে লাগিয়ে নিয়েছে পলিথিন। ওঠানামা চলে মই দিয়ে। রোজ সকালে কাছা দিয়ে সাঁতার কেটে সে উঠে জেগে থাকা সড়কে। সাথে পলিথিনে থাকে শুকনো জামা আর লুঙি। সমস্যায় পড়ে কুসুম। ভেজা শাড়িতে ড্যাবড্যাব করে চোখ দিয়ে তাকে ছিঁড়ে খায় পুরুষের দল। এই বিপদে সেও জুটিয়ে ফেলে কালো পুরনো একটা বোরকা। সাঁতার শেষে পথে উঠেই ব্যাগ থেকে বোরকা বের করে নিজেকে দেয় সে ঢেকে। কাজের বাড়ির ম্যাডামকে বলে সে তার আরেকটা শুকনো জামা ওই বাসাতেই রাখার অনুমতি নিয়ে নেয়। 

মিষ্টি এখন যেন আরও বড় হয়ে যায়। কত দায়িত্ব ছোট কাঁধে! বোনকে নিয়ে তার কত গবেষণা! মা বলেছে পানি গরম করে দুধ বানাতে হবে। এখনতো মাটির চুলার জ্বালানি পাওয়া কঠিন। কেরোসিনের স্টোভ কিনে ফেলেছে তাই আয়নাল। পানি কতটুকু গরম করতে হবে? বেশি গরম করলে মুখ পুড়ে যাবে মিঠু’র। মা বলেছে সাথে মিছরি দিতে। আজ একটু চিনি মেশালে কেমন হয়? মা বলেছে তিন ঘণ্টা পরপর খাওয়াতে। আচ্ছা, মাঝে আরেকবার দিলে কেমন হয়? বন্যার দিনগুলোতে মিষ্টি যেন মিঠু’র মা হয়ে যায়।

তার গবেষণার মূল বিষয়বস্তু অবশ্য মিঠু’র থাকার জায়গা। বৃষ্টি লেগেই থাকে সারাদিন। জোরে বাতাস ছাড়লে পলিথিন ছিঁড়ে যেতে চায়। বৃষ্টির ছিটা এসে ভিজিয়ে দেয় ওদের। এই বৃষ্টির জল গায়ে লাগলেই জ্বর, ঠা-া লাগবে। ওষুধ কিনতে হবে। এত টাকা বাবা কোথায় পাবে? ভেবে ভেবে একটা বুদ্ধি বের করে ফেলে মিষ্টি। ওয়োরড্রৌবের ভেতর পিচ্চিটাকে ঢুকিয়ে রাখলে কেমন হয়? এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর হয়না। কাঠের ওয়োরড্রৌব। চারটা ড্রয়ার, একটার নিচে আরেকটা। পাশে আরেকটা লম্বা খুপরি। ওটাতে শীতের কম্বল, মশারি রেখে দিয়েছে কুসুম। চারটা ড্রয়ারের একটাতেই রাখতে হবে মিঠুকে।

ছোটখাটো মিষ্টি’র জন্য নিচের ড্রয়ারটাই সবচেয়ে সহজ। উপরেরটা সে নাগাল পেলেও উঁকি মেরে দেখতে পারে না। মিঠু কখন জাগবে, খাওয়াতে হবে, প্র¯্রাব করেছে কিনা সেটা বোঝা কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া একবার প্রস্রাব করে দিলে কাঠ বেয়ে বেয়ে নিচের ড্রয়ারগুলোতে চলে যাবে। কিন্তু নিচের ড্রয়ারটা ইঁদুরের আস্তানা। পুরনো ওয়োরড্রৌবের নিচের দিকে খুপরিতে ওরা থাকে। কোনভাবেই ওদের উৎপাত থেকে বাঁচা যায়না। এই বন্যাতেও ওরা যেন মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসে। ওরা নিশ্চয়ই মিঠুকে কামড় দিবে। নিচের ড্রয়ারে রাখা যাবে না ওকে।

নিচ থেকে দ্বিতীয় ড্রয়ারটাতে আবার প্রচ- আরশোলার উপদ্রব। ফ্রক বের করে পরার আগে মিষ্টি ভালো করে ঝেড়ে নেয় আগে। কালো কালো শুকনো আরশোলার বিষ্ঠা ছড়িয়ে থাকে মেঝেতে। এই বিষ্ঠা মিঠু’র পেটে গেলে নির্ঘাত ডায়রিয়া হবে। এর ঠিক উপরের ড্রয়ারেও আরশোলা হানা দেয়, তবে প্রতিদিনের পরার জামা সেখানে থাকে বলে খুব বেশি বিষ্ঠা জমেনা ওখানে। তবে সমস্যা হচ্ছে ওটাতে মিঠু প্রসাব করলে নিচের দুইটা ড্রয়ারেও চলে যাবে। অনেক চিন্তা করে মিষ্টি পলিথিন কেটে, আর ভাত ডলে ডলে আঠা বানিয়ে একটা ব্যাবস্থা করে ফেলে। হাফপ্যান্টের মত করে পলিথিন প্যাঁচিয়ে দিলেই নিশ্চিন্ত। কিছুক্ষণ পরপর দেখলেই হবে পলিথিনে মূত্র জমেছে কিনা। কোনো জামার সাথে প্র¯্রাবের মাখামাখি হওয়ার চিন্তা থাকবে না।

কত বড় একটা আবিষ্কার করে ফেলেছে সেটা মিষ্টি প্রথমে বুঝতে পারেনি। আগে ঝড়ো বৃষ্টি হলে বোনটাকে আগলে রাখতে বেশ বেগ পেতে হত তাকে। এখন ড্রয়ারে রেখে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিলেই খালাস। একটু অবশ্য ফাঁকা রাখতে হয়, না হলে দমবন্ধ হয়ে মরে যেতে পারে। তবে বৃষ্টির জলের একটা অণুও মিঠু’র গায়ে লাগার সম্ভাবনা নেই। আবার ওখানে রেখেই পানি গরম করা, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া, কিংবা ছাদে একা একা এক্কাদোক্কা খেলা সব সহজ হয়ে গেছে।

দুই দিনের দিন মিষ্টি কুসুমকে বলে তার কীর্তির কথা। কুসুম শুনে অবাক হয়।

‘কী কস তুই? পইড়া গেলে’?

‘পড়ব ক্যামনে? এইটাতো নড়েও না, চড়েও না। চিত হইয়া হুইয়া থাকে সারাদিন’।

‘দম বন্ধ হইয়া মইরা যায় যদি’? 

‘তোমারে কইছে? আমি একটু ফাঁক রাখি বাতাস যাওয়ার লেগা। দম ঠিকই নেয় মিঠু’।

‘ফাঁক রাখস, আরশোলা ঢুকবোতো ভিতর। হাইগা নষ্ট করব সব’।

‘তুমি তো লাগাইয়া রাখো, তারপরও আরশোলা আটকাইতে পারছো? আমি বরং বইয়া বইয়া আরশোলা মারি। তুমি ড্রয়ার খুঁইজা দেখো। আরশোলা পাইবা না একটাও। কালো গু’ও নাই। সবকিছু আমিই পরিষ্কার কইরা রাখি’।

‘মুত লাইগা কাপড় গান্ধা হইয়া গেলে কিন্তু তোর বাপে চিল্লাইবো। আর হাগলে কী করছ তুই’?

মিষ্টি তার মাকে পলিথিনের ন্যাংটির মত জিনিসগুলো দেখায়। এই দেশে পলিথিনের মত সহজলভ্য বস্তু আর নেই। মানুষজন ইচ্ছেমতো পলিথিন ব্যবহার করে আর ফেলে দেয় যেখানে সেখানে। বন্যার জলে সেই পলিথিন ভেসে আসে। নিচে নামলেই শত শত পলিথিন। মিঠু’র পলিথিনের ন্যাংটিও তাই অসংখ্য। এতক্ষণে কুসুমের মুখে স্বস্তির হাসি আসে। সে এর মধ্যে বিকেলেও কাজ নিয়েছে। মেয়েটা না থাকলে, এত বুদ্ধি না থাকলে সমস্যায়ই পড়ে যেত সে।


দুই সপ্তাহেও বন্যার জল নামার নাম নেই। আয়নাল সেদিন বলছিল বন্যা এবার রেকর্ড করছে। এত বেশি দিন জল জমে থাকার নজির নেই গত ত্রিশ বছরে। তাদের সমস্যা হচ্ছে এই জল বদ্ধ জল। সহজে নামবে না। ছাদে বসবাস তাই চলতেই থাকে। সেদিন দুপুরের দিকে মিষ্টি নেমেছিল প্রাকৃতিক কাজ সারতে। একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। এসে প্রথমেই ড্রয়ারে দেখতে গিয়েছে মিঠু প্রস্রাব করেছে কিনা। ড্রয়ার টান দিতেই সে ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। কালো একটা বিড়াল গুটিসুটি পাকিয়ে শুয়ে আছে মিঠু’র ঠিক পাশেই। ওর চিৎকার শুনেই এক লাফ দিয়ে পালালো চতুষ্পদ জন্তুটা। বিড়ালটা এলো কিভাবে? ওরা কি সাঁতার জানে? নাকি নিচের ঘরেই লুকিয়ে ছিল? এসব ভাবতে ভাবতেই সে মিঠু’কে কোলে নিয়ে উলটেপালটে দেখে। কামড় দেয়নি তো জানোয়ারটা?  এই বোকা পিচ্চিতো কাঁদেও না। অক্ষত মিঠু’কে দেখে মিষ্টি হাফ ছেড়ে বাঁচে।

মিষ্টি দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। এত শত্রু চারদিকে। ইঁদুর, আরশোলার সাথে যোগ দিয়েছে বিড়াল। এত শত্রু থেকে বেঁচে থাকতে হয় মানুষকে। এটাই বাস্তুতন্ত্রের আদি সূত্র। এদের চেয়ে বড় শত্রু বন্যার জল। মিঠু ঘুমিয়ে গেলে মিষ্টি ছাদে বসে দেখে চারদিক। তাদের ছাদটাকে মনে হয় দ্বীপের মত। আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। বৃষ্টি হবে যেকোনো সময়। মিঠু’কে আরেকবার দেখতে আসে সে। ঘুমিয়ে আছে লক্ষ্মী হয়ে। ভালো করে পলিথিন প্যাচিয়ে আবার আসে সে ছাদের কিনারায়। তাদের ঘরের সামনে একটা নৌকা ভিড়েছে। নৌকায় মাঝির সাথে একটা লোক। লোকটাকে ভালো করে চিনে মিষ্টি। চৌধুরী, ওদের বাড়ির মালিক। বিড়াল দেখার চেয়ে বেশি চমকে উঠে মিষ্টি। আতঙ্ক গ্রাস করে এগারো বছরের একলা মেয়েটাকে।

গত শীতের কথা। ওদের ক্লাসেই পড়ত সোনিয়া। বরপা’র এক বস্তিতে থাকত ওরা। একদিন রাতে হইচই পড়ে গেল। সন্ধ্যা থেকে পাওয়া যাচ্ছে না মেয়েটাকে। এদিকে সেদিকে কত খোঁজাখুঁজি হলো। মসজিদের মাইকে মাইকে ঘোষণা হলো। ‘একটি নিখোঁজ সংবাদ। সোনিয়া নামের একটি দশ-এগারো বছরের মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়েটি দেখতে ফর্সা, চেহারা গোলগাল। উচ্চতা চার ফুটের কাছাকাছি। মেয়েটির পরনে ছিল লাল ফ্রক আর সবুজ পায়জামা। কোন সহৃদয় ব্যক্তি সোনিয়াকে খুঁজে পেলে কাছাকাছি যেকোনো মসজিদের ইমামের সাথে যোগাযোগ করবেন’।  মাঝরাতে খুঁজে পাওয়া গেলো মেয়েটাকে। সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ভাগাড়ের পিছনে পড়ে ছিল নিথর দেহ। গায়ে একটা সুতোও নেই। পেশাবের জায়গাটা রক্তাক্ত আর ফোলা। জনস্রোতের সাথে দৌড়ে মিষ্টিও চলে গিয়েছিল সেখানে। রক্তাক্ত, ফোলা আর ছিঁড়ে যাওয়া পেশাবের রাস্তায় মাছি উড়ছিল ভনভন করে। সাথে সাথে বমি করে দিয়েছিল সে। 

সে রাতে কাঁপিয়ে জ্বর আসে মিষ্টি’র। এরপরে আর কিছু মনে নেই। পরে শুনেছিল রাতে পুলিশ এসেছিল। ওর চাচাতো এক ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সোহাগ ভাই। ওকেতো চিনে মিষ্টি। ক্লাস নাইনে থাকতেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল। গত ঈদে সোনিয়ার সাথে ওকেও আইসক্রিম কিনে দিয়েছিল। সেই সোহাগ ভাই এমন করে সোনিয়াকে ‘মারল’। এমন বিবস্ত্র করে ‘মারা’কে কী বলে জানত না সে। ক্লাসের ইঁচড়ে পাকা কয়েকটা মেয়ে ওকে পরে বুঝিয়ে বলেছে। এটাকে বলে ‘ধর্ষণ’। পুরুষ মানুষ খুব ভয়ঙ্কর ধরণের জন্তু। একলা পেলেই এরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েদের উপর। ছিঁড়েফুঁড়ে রক্তাক্ত করে ফেল দিয়ে যায় আবর্জনার ভাগাড়ে। 

চৌধুরী লোকটাকে মিষ্টি ভয় পায় খুব। যে কয়বার ওদের এখানে এসেছে মিষ্টিকে আদর করেছেন তিনি। প্রতিবার বুকের এখানে আঙুল দিয়ে টিপে দিয়েছেন। ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েছে মিষ্টি। ওর বাবা আর মা দেখেনি এসব। জানেনা কিছুই। শেষবার সিঁড়িতে মিষ্টিকে ডেকে নিয়ে আঙুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিয়েছিল ওর পেশাবের রাস্তার উপরে। কুসুম লোকটার কথা উঠলেই বলে, ‘খানকির পুত একটা লুইচ্চা। নজর খারাপ শুয়ারের বাচ্চার’। ‘লুইচ্চা’ কথাটার মানে ততোদিনে শিখে গিয়েছে মিষ্টি। ওর মা কিভাবে জানে এসব? ভেবে কূল পায়নি মিষ্টি। ওর মা’কেও চৌধুরী ‘আদর’ করেনিতো? সেও তো একটা মেয়ে মানুষ।

আজ বাসায় মা’ও নেই, বাবা’ও নেই। সিংহের সামনে একলা খরগোশের গল্পটা জানে মিষ্টি। সে ভয়ে কাঁপতে থাকে। সোনিয়ার চেহারা বারবার চোখে ভাসে তার। দুই মাস সে ভাত খেতে পারেনি। ভাতের বাসনের সামনে মাছি দেখলেই মনে হতো এই বুঝি সোনিয়ার পেশাবের রাস্তা চেটে এসেছে। বমি আসত মুখ ভরে। সে যেন কানে শুনতে পায় সেই ভনভন শব্দ। নাকে ভেসে আসে ভাগাড়ের গন্ধ। শরীরে স্পর্শ পায় ভয়ঙ্কর কোন বিষাক্ত আরশোলার। 

চৌধুরী মই বেয়ে চলে আসে ছাদে। আয়নালকে সে দেখে এসেছে অটো চালাতে। কুসুম নেই সেটাও জানে ভালো করে।

‘মিষ্টি মামনি, ও মিষ্টি মামনি। কই গেছো আম্মা? তোমার জন্য চকোলেট আনছি। খাইবা না। ক্যাডবারি চকোলেট। চুইষা চুইষা খাইতে হয়। কই পলাইছো আম্মা’?

ওয়োরড্রৌবের পাশের লম্বা খুপরিতে লেপ আর মশারির ভাঁজে লুকিয়ে আছে মিষ্টি। ভয়ে তার বুক কাঁপছে। চৌধুরীর প্রতিটা পায়ের শব্দ, শ্বাসের ফোঁসফোঁস শুনতে পাচ্ছে সে। পাশের মিঠু’র ড্রয়ারটাও সে বন্ধ করে দিয়ে এসেছে। দম হয়তো বন্ধ হবেনা। কিছুটা বাতাসতো আছেই। বিড়াল, ইঁদুর আর আরশোলার মত জন্তুদের উপদ্রবের কথা সে ভুলেই গেছে।

একটা দোপেয়ে, মানুষের মত দেখতে জঘন্য অশ্লীল এক জানোয়ার গর্জন করছে তার কয়েক হাতের মধ্যে। পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে আসছে মিষ্টি’র। প্রতিটা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সে কুঁকড়ে যেতে থাকে।   


মাতুয়াইল, ঢাকা। 

 

ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ২১৩

ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ২১৩

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর ।। বর্ষ ৮ম ।। সংখ্যা ২১৩,

শুক্রবার, ০৩ মে ২০২৪, ২০ বৈশাখ ১৪৩১, ২৩ শাওয়াল ১৪৪৫।


















নলিনীর দ্বিতীয় চিঠি

নলিনীর দ্বিতীয় চিঠি


নলিনীর দ্বিতীয় চিঠি

আসহাবে কাহাফ 


সকাল সাতটা বেজে উনিশ মিনিট, আমি তখনো পূজোর ঘরে শঙ্খধ্বনি দিচ্ছিলাম। হঠাৎ করে, বাইরে থেকে কে যেন কলিং বেলটা বার বার বাজিয়ে যাচ্ছিল। তড়িঘড়ি করে পূজো শেষ করে দরজা খুলতেই দেখি ডাকহরকরা। অনেক বছর পর এই বাড়িতে আবার ডাকহরকরা এসেছে। আমার এখনো খুব ভালো করে মনে আছে; এই সেই ডাকহরকরা যিনি ২১ বছর আগে শেষবার এসেছিল। তখন তিনি মধ্যবয়সী যুবক আর আমি একেবারে তরুণ। এখন আমি হলেম মধ্যবয়সী আর তিনি বৃদ্ধ। আজ আবার নতুন করে বুঝে নিলাম, বয়স অনেক বেড়েছে, কালের অতলে হারিয়ে ফেলছি নিজের সোনালি যৌবন। তাহলে আমি কি তারুণ্য হারিয়ে ফেলেছি? ঠিক এই মুহুর্ত্বে সেটা নিশ্চিত করে বলা কিংবা কারও কাছে প্রমাণের ইচ্ছে শক্তিটুকুন আমার নেই। বৃদ্ধ মশাই দাড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলবেন? কারও ডাক এসেছে? উত্তরে বাবু মশাই বলল; হরিনাথ বাবুকে? গতকাল, কলিকাতা হতে তাহার নামে একখানা ডাক এসেছে। ডাকের উপর আর্জেন্ট লিখা ছিল তাই দ্রুত নিয়ে এলাম।


বৃদ্ধ ডাকহরকরা মশাই হয়তো মনে করতে পারছেন না, ঠিক ২১ বছর আগেও তিনি আমাকে এই রকম আর্জেন্ট লিখা একটা চিঠি দিয়ে গিয়েছিল; আর সেটাই ছিল এই বাড়িতে তার শেষ চিঠি। বয়স হলে যা হয়, আমি কিন্তু ঠিকই তাকে চিনতে পেরেছি। আফসোস, এই সময় এই স্মৃতি একদিন আমারও বিলুপ্তি হবে। একদিন আমাকে দেখেও কেউ একজন স্বগতোক্তি করবে! গোপনে স্মৃতি হাতড়াবে! তিনি যথারীতি চিঠি হাতে তুলে দিয়ে প্রাপ্তিস্বীকারপত্রে সাক্ষর আদায় করে বিদায় নিলেন। আমার গৃহদ্বারে পড়ে রইললাম শুধু চিঠি সমেত আমি ও আমার পুরোনো স্মৃতির একঝাক না বলা প্রশ্ন। ভাবছি চিঠিটা খুলেই ফেলি; পড়ে দেখি ভিতরে কী লিখেছেন! কিন্তু পূজোর ঘরের কথা ভেবে রেখে দিলাম। চিঠিটা কার তা এই মুহুর্ত্বে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়; চিঠির উপর নাম লিখেছেন রাম দত্ত। পাশে ব্র্যাকেটে লিখেছেন কেউ একজনের পক্ষে। বেশ মনে ধরেছে কথাটা। এর আগেও অনেকে আমাকে এই ধরনের চিঠি লিখেছেন, তখন আমি এফএ ক্লাসের ছাত্র ছিলাম। মাঝে মাঝে পত্রিকায় লিখতাম বলে, কেউ কেউ চিঠি লিখিত আর খামের উপর বিভিন্ন রসিকতাপূর্ণ শব্দ লিখত। নলিনীর বিয়ের পর লেখা-লেখিও ছেড়ে দিলাম; চিঠি আসাও বন্ধ হয়ে গেল। চিঠিটা রেখে সোজা চলে গেলাম পূজোর ঘরে।


সব কাজকর্ম গুছিয়ে বেলা এগোরোটার দিকে চিঠিটা হাতে নিলাম। খুলে দেখার আগে প্রায় বার দশেক চেষ্টা করলাম রাম দত্ত বাবুকে চেনার, কিন্তু কিছুতেই আন্দাজ করতে না পেরে অবশেষে চিঠিটা বের করলাম। চিঠির হাতের লিখা ও ভাষা বেশ পরিচিত, তবে কে লিখেছে সেটা মনে করতে একেবারে সময় লাগে নি যে তা নয়, কেননা, চিঠির ভাষা কখনই একজন পুরুষের ছিলো না, ফলে শেষ পর্যন্ত পড়তেই হল। মাঝখানে বেশ কিছুক্ষণ আমাকে থামতে হয়েছে; ফিরে যেতে হয়েছে ছাত্র জীবনের শেষ অংশে। চোখের সামনেই ভেসে উঠেছে একুশ বছর আগের লিখা নলিনীর সেই প্রথম চিঠি; যেখানে নলিনী লিখেছেন-

তাং- ১ লা জুলাই ১৯৯৫ইং

প্রিয় নাথ,

প্রারম্ভে ভক্তি নাথের চরণে; অতপর আমার প্রাণ নাথের কদমে। প্রাণ নাথ, আজি বড়ো ব্যথা বক্ষে লইয়ে তোমাকে পত্র লিখিতে বসিলাম। পাশাপাশি থাকি বলিয়া কোনদিন আমাদিগের চিঠি লিখিয়া মনের কথা বলিতে হয়নি। আজিই প্রথম ; হয়তো আজিই শেষ! প্রাণের শৈশবসঙ্গী বলিয়া যাহারা তোমার আমার সম্পর্ক চাপিয়ে যাইতেছে তাহাদের কি বলিয়া অভিশাপ দিব তাহা আমার জানা নেই। তবে কি বলিয়া এই মুহুর্ত্বে তোমার আমার বিচ্ছেদ টানিয়া লইব সেই চেষ্টা করিতেছি। প্রাণ নাথ, গত দুই তিন রাত্রিকাল যাবত, আমি কিছুতেই নিদ্রা যাপন করিতে পারছি না। যখন দেখি পরিবারের সবাই কলিকাতার ভদ্রপতির সহিত আমার বিবাহের কথা বলাবলি করিতেছে। আমরা একত্রে বড় হইয়াছি, খেলাধুলা করিয়াছি তাহা সকলে দেখিয়াছে ঠিকই কিন্তু আমাদিগের মনের মিলন কেহ দেখিয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে না। আমরা একে অপরকে কতটা নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছি তাহা কেহ বিশ্বাস করিবে না, কেহ যদিও বিশ্বাস করিবে বলিয়া মনে হইয়াও থাকে তবে এই কথা সত্য যে, এমতাবস্থায় আমি অথবা তুমি কাহারও সম্মুখে, সম্পর্কের কথা তুলিয়া ধরিবার মত যোগ্যতা অর্জন করিনি। এখনো আমি আর তুমি সবেমাত্র এফএ ক্লাসে পড়িতেছি। এই অবস্থায় যেকোনো পিতা-মাতা আমাকে তাহার পুত্রবধু করিয়া লইতে আপত্তি না করিলেও এফএ ক্লাসের একজন ছাত্রের সহিত মেয়ের বিবাহ দিতে আমার মাতা-পিতা ঠিকই আপত্তি জানাইবেন। তোমাকে শুধুমাত্র এফএ ক্লাসের ছাত্র ও বেকার বলিতে আমার কেনো জানি সংকোচবোধ হইতেছে, তুমিতো ইতোমধ্যে লেখা-লেখি শুরু করিয়াছ, পত্র-পত্রিকায়ও তোমার কিছু কিছু লিখা ছাপাইতেছে। তারপরও তুমি তাহাদিগের কাছে কর্মহীন, কেনন, এই সমাজে নগদ অর্থ ব্যাতিত কারও প্রতিভার মর্ম বুঝিতে পারিবে এমন মনমানসিকতা সবার তৈরী হয়নি। প্রাণ নাথ, তাই আমি অনেক ভাবিয়া দেখিলাম কলিতার ভদ্রপিতকে বিবাহ করিয়া লওয়াই উত্তম হইবে। আরেকটি কথা বলিয়া লই, আমি হয়তো কথাগুলি খুব সহজেই বলিয়া লইতেছি দেখিয়া তুমি অবাক হইবে! আমাকে লইয়া নানা খাটো কথা মনে মনে উচ্চারণ করিয়া থাকিবে। তারপরও হে প্রাণনাথ, এই কথায় সত্য যে; আমি তোমার সহিত যা করিয়াছি তার পুরোটাই ছিলো আমার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ওখানে বিন্দুমাত্র ত্রুটি কিংবা ছলনা ছিলো না। প্রাণনাথ, আজি এই কথাগুলো তোমাকে বলিতে পারিলেও নিজের ভিতরে যে কারবালর রক্তক্ষরণ বহিয়াছে তাহা আমি দেখাইয়া বুঝাইতে পারিব না। আগুনে সব কিছু জ্বলিয়া যাইবার পরে আগুনের যে স্তুপ হয় সেখানেও আগুনের একটা দহন থাকে; যা কেহ দেখিতে পারে না। সেই একইরকম আগুনের তীব্রতা আজি আমার বুকে। প্রাণনাথ, আমি হয়তো মরিতে পারিলেই বাঁচিয়া যাইতাম ; কিন্তু আরও অনন্তকাল তোমার ভালোবাসার বিরহে প্রজ্জ্বলিত হওয়ার স্বাদ গ্রহণের জন্য বাঁচিবার ইচ্ছে জাগে। হয়তো পৃথিবীর কোনো একজায়গায় বসিয়া নিরবে তোমার স্মৃতি মন্থন করিয়া দুফোটা চোখের জল ফেলিয়া আরও শত বছর বাঁচিয়া থাকিব। প্রাণনাথ, আমাকে এই চিঠির প্রতিত্তোর করিবে না। এই চিঠি যখন তোমার হাতে পৌছাবে তখন আমি অন্যের ঘরণী। আমার জন্য দুঃখ না করিয়া, তোমার জীবনকে জীবনের পথে বয়তে দিও। বাঁচিয়া থাকিলে কোনো দিন তোমার সম্মুখে আসিব না, আবার জীবন থাকিতে তোমাকে এক মুহুর্ত্বের জন্যও ভুলিয়া যাইব না। প্রাণনাথ, বিদায় জেনো।

ইতি

নলিনী ব্যানার্জী।


আমি অবশ্যই তখন এক প্রকারে বাকশক্তিহীন হয়ে পড়েছিলাম। নলিনীও বিয়ে করে কলিকাতা চলে গেলো। সেই যে গেলো আর কেউ কারও সাথে কখনো যোগাযোগ করিনি। আজ ২১ বছর পরে এসে, আবার নলিনী আমার চোখে জল এনেছে! মনের আকাশে কালো মেঘ, সেই মেঘ হতে বৃষ্টিপাত! অতপর ভালোবাসার গন্ধ মেখে আখি জলে স্নান। এটা নলিনীর দ্বিতীয় চিঠি; প্রায় তিন তিনটা রাত জেগে সে আমাকে লিখেছে-

তাং-১২/০৭/১৭ ইং

প্রিয় নাথ,

প্রারম্ভে প্রণাম রইল। হয়তো কিছুটা বেগ পাইতে হইবে এই চিঠির কারণ বিষয় প্রেরক ইত্যাদি খুঁজিয়া পাইতে। তবে নিশ্চয় জানিবে, এই চিঠি নারী জাতির কোনো একজন লিখিয়াছে; যে কিনা যৌবনকালে আপনাকে ভালোবাসিয়াছিল। শুনিয়াছিলাম আপনি বিবাহ করেননি। সেটাই উত্তম করিয়াছেন। আমি বিবাহ করিয়াও সেই আপনার ভালোবাসাটা ভুলিতে পারি নাই। ইতোমধ্যে আপনার প্রকাশিত বেশকিছু বই আমি পড়িয়াছি। আমার সাহেবও আপনার লিখার দারুণ ভক্ত। সেই হিসেবে আপনার বই পড়া। প্রায় তিন রাত জাগিয়া আপনাকে এই পত্র লিখিতেছি, একবার লিখে ভুল হয় ভাবিয়া আবার লিখি। আমার স্বামী আড়াল হইতে দেখে আর হাসে। সে আপনার আমার বিষয়ে সব জানিয়াছে; হয়তো আমি মরিবার পরে সে এই চিঠিটা তোমার কাছে পৌছাইয়া দিবে। আমি মরিলে আপনাদের বাড়ির সম্মুখের পুকুরে, আমাকে মনে করিয়া একখানা লাল গোলাপ ছুড়িয়া মারিবেন। আজি ২১ বছর পরে আসিয়া এই চিঠি লিখিবার পিছনে একটিই কারণ রহিয়াছে, যাহার জন্য আপনি মনে মনে আকুল হইয়া উঠিয়াছেন! আমার বড্ড জানিতে ইচ্ছে করে- আপনি বিবাহ করেননি কেন? আমাকে ভালোবেসে নাকি অভিমানে? উত্তর করিতে হইবে না। কেবল আপনার নিজের কাছে উত্তর করিলে হইবে। কেননা, এই চিঠি যখনি আপনার হাতে পৌছাইবে, তখন আমি গত হইব। প্রাণ নাথ, ভালো থাকিবেন।

ইতি

নলিনী রাম দত্ত

কলিকাতা, ভারত।


পাঠান্তে, ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। এবার নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলাম, এই একাকী জীবনের কারণটা কি নলিনীর ভালোবাসা নাকি চাপা অভিমান? কোনো প্রতিত্তোর নেই হৃদয়ের গভীরে। কেবল চোখে বেয়ে নিচে নেমে এলো কয়েকফোঁটা জল।


পদাবলি

পদাবলি

 



ডুবুরী হওয়ার গল্প

আশরাফ চঞ্চল 


কতটা গভীরে গেলে ছুঁয়া যায় জল

মাপা যায় গভীরতা

নদীর অতল?

সাঁতার জানো না তাতে ভয় কী

সাহস রেখে নেমে পড়ো

হাত নাড়াও

পা নাড়াও

একদিন সব শিখে যাবে।


বেশিক্ষণ দম থাকেনা?

তবে শোনো-

প্রমথেই ডুব দিওনা

ওপরে ওপরে ঘুরো

হাত চালাও

ঠোঁট চালাও

ঢেউয়ে ঢেউয়ে সব জল ঘুলিয়ে দাও

শৃঙারে শৃঙারে ডুব দিয়ে ওর পতন ঘটাও


পারো যদি নিয়মিত দুধ কলা খাও

মাঝে মধ্যে ডিম

কালোজিরা 

মধু 

কস্তুরী 

হেকিমি শা¯্রে এগুলো নাকি শক্তি বাড়ায়!


একটি কাজ একইভাবে বারবার করোনা

প্রতিবার কাজে নতুনত্ব আনো

শুধু দক্ষিণে কেনো

উত্তরেও যাও

পূর্বে

পশ্চিমে গেলে

কেঁপে কেঁপে উঠবে সমস্ত জল

নদীতে জোয়ার আসবে

স্রোত বইবে।


এভাবেই তুমি একদিন দক্ষ সাঁতারো হবে

অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই

ডুবুরী হয়ে ছুঁয়ে আসবে নদীর পাতাল

বউ বলবে, তুমিই শ্রেষ্ঠ পুরুষ

ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট! 




ঘুমের মৃত্যু

জয়িতা চট্টোপাধ্যায়


একটা শব্দে মৃত্যু হল সমস্ত ঘুমের

যে শব্দ ছিল হত্যার

বুকের উঠোনে, দিগন্ত রেখায়

কালো রং ছড়িয়ে যাচ্ছে

কে যেন ভালোবাসা পুড়িয়ে দিল আগুনে

সুরঙ্গে লুকোনো ছিল পুরোনো বারুদ

নিমেষেই চিতাভস্ম ছড়িয়ে গেলো

শীতের প্রবাহিত খরগ, ছিন্নভিন্ন মেঘ

ইতিহাস হারা সমস্ত গল্প,

গুহার ছবির মতো ভেঙে গেল 

মুখের চেনা ধ্রুবতারা

কালশিটে পড়া শীত কালের অবসান হল।




এতো সহজে ভোলা যায় না

জহিরুল হক বিদ্যুৎ


এতো সহজেই কী ভুলে থাকা যায়?

মৌন রাতের অবগুণ্ঠন সরিয়ে

যে চোখের পাতায় নেমে এলো কবিতা

জলের গানে স্নিগ্ধ প্রভাত হলো লীন

চায়ের কাপে মায়া ছড়ালো যে ওষ্ঠের চুম্বন

ঠুনকো অভিমানে কী ভুলে থাকা যায়?

হয়তো আবেগের ছলে বেহিসাবি ভুলে

মনখারাপ নিয়ে শুধুই ভুলপথে ছুটে চলা-

মায়ার শেকড় ছড়িয়ে আছে গভীরে,

বিস্তৃত প্রান্তর, রয়ে যায় জন্ম-জন্মান্তর

যেখানে মায়া নেই

সেখানে ভালোবাসাহীন ধূধূ মরুভূমি।

মায়ার কাটা বিঁধেছে যে বুকে

সে বুক তুমিহীনা মরে ধুঁকে ধুঁকে।



      

এক পলক দেখে যাওয়া

আদনান আল মিসবাহ


সেদিন

আলাপনের শুভ্রতা প্রদীপের মতো ছিল না 

সিঁড়ির শেষবিন্দুতে উপনীত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে

কোলাহলের বিরক্তিকর শরীর ক্ষতবিক্ষত করেছে 

নাতিদীর্ঘ পথ পেরিয়ে তোমার 

এক পলক দেখে যাওয়া


বাঁ দিকের গলি থেকে উদ্ভাসিত 

প্রেয়সীর মুখ 

চোখাচোখি হওয়ার মত বাহারি দৃশ্য ছিল না 

নদীর মতো নিরবধি বয়ে যাওয়া বিস্ময়ের মাথা

কুঠারাঘাতের নির্মমতায় থমকে দিয়েছে 

ভ্রুকুঞ্চিত শ্রীমান মুখাবয়বে তোমার 

এক পলক দেখে যাওয়া


সময়ের পরিসীমা 

বাঁধন ছিন্ন করার মতো তীব্র বেগবান ছিল না 

অসংখ্য প্লেটের ঝনঝনানি 

কোনরূপ পূর্ব সংকেত ছাড়া আচমকা মরে গেছে 

এমনকি-

মিনিট সেকেন্ডের অমোঘতাকে হত্যা করতে পারে 

কৌতুহলী মননের মৃদু তাড়নায় তোমার 

এক পলক দেখে যাওয়া


ক্ষনিকের ম্রীয়মান কথকতা

খুব বেশি রসালো আবেগপূর্ণ ছিল না 

বাক্য শেষ হওয়ার আগেই প্রশ্ন চিহ্ন 

শরীরের লোমগুলো দ-ায়মান 

যেনো ডিসেম্বরের কুচকাওয়াজ 

আতঙ্ক, ত্রাস, হুমকির মতো ভয়াবহতা ছড়িয়েছে

ঈর্ষান্বিত রক্তচক্ষু নিয়ে তোমার 

এক পলক দেখে  যাওয়া



শিক্ষিত নপুংসকের কবলে

রেজা কারিম 


কিছু শিক্ষিত নপুংসককে আমার চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখি

খুব রাগ হয় আমার 

বুকের ভেতরটা রাগে গজগজ করতে থাকে।


আমার ধারণা এরা এমন ছিল না

এদের পুরুষত্ব ছিল 

কিন্তু কিছু দায়িত্বের কারণে 

কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে

এরা আজ পুরুষত্বহীন।


কী ভাবছেন? 

এরা কি আসলেই ফিজিক্যালি অক্ষম?

না, মোটেই তা নয়।


এরা নামে পুরুষ কামে পুরুষ 

ঘামে পুরুষ পামে পুরুষ

আক্ষরিক নয় ভাবার্থে ভাবুন

প্রত্যক্ষ নয় পরোক্ষভাবে দেখুন

খুঁজে পাবেন আমার কবিতার সত্যতা।


এদের হৃদয় নেই 

বিবেক ঘুমন্ত কিংবা মৃত

বাইরে চাকচিক্যময় 

ভেতরে শূন্য, মহাশূন্য

মাকড়শার জালের মতো এরা আমায় আষ্টেপৃষ্টে ঘিরে রেখেছে 

একদিন আমিও এদের মতো নপুংসক হব

আমার কাপুরুষোচিত আচরণ তারই ধ্রুব বহিপ্রকাশ।


তবু হৃদয়ের কোথায় যেন এদের জন্য আমার সীমাহীন ঘৃণা রয়েছে 

আসলে আমরা অনেক কিছুই মেনে নেই 

কিন্তু মনে নেই না।



অদৃষ্ট মঞ্চ

রহিত ঘোষাল


এখন খুব নিরিবিলি চারিদিক,

এখন সূর্যের তেজ কমে এসেছে,

ভেড়ার পাল বাড়ি ফিরছে,

গাঁয়ের মুরুব্বিদের ভিড় সাঁঝেরবেলা

চায়ের দোকানে, ওরা বলাবলি করে,

দেশে কি মানুষ আছে গো!

মানুষ নেই, সব এক একটা জানোয়ার!

আরো কত সাতপাঁচ কথা, 

এইসব দশা ছেড়ে উঠে আসি

আমাদের জৈব পাঁজরে সংকট

নিকটতম অক্ষমতা জন্ম দেয় উগ্রপ্রকৃতির

দিগন্তপ্লাবী আমাদের এই জৈবনিক দ্বন্দ্ব

ত্রসরেণু হয়ে ইহজন্মের সকালে পরিণত হয়।


তিতাসের মেয়ে

নাঈমুর রহমান


তিতাসের মেয়ে মিস দেবনাথ,

তোমার শরীরে এখনো বয় তিতাসের জলের ঘ্রাণ?

পৌঁছায় কি তোমার কানে আজও

ভরা যৌবন তিতাসের আহ্বান?

অথচ তিতাস এখন ছোট, ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।

আর বেড়ে গেছো তুমি, তোমার ঘাড়ে পরা চুল থেকে

এখন আর ঝরেনা টুপটুপ তিতাসের জল

সে চুল ছুঁয়েছে এখন নিতম্ব।

তিতাস পাড়ের কাদা-বালি মাখা পা দুটো

করছে পদচারণ শহর রংপুর, জেনিস সু তে।

তিতাসের কিনারায় এসে আজও জড়ো হয় বকের ঝাঁক

আছে কিছু মাঝি-মাল্লার চিৎকার।

কিন্তু কেউ আর তোমার মতো দেখেনি

বলেনি কেউ করছো কি, তিতাস যে ছোট হয়ে হয়ে যাবে।

হয়ত তখন ছোট ছিলে, খুব ছোট

যখন বলেছো তিতাস আমার বাড়ি, তিতাস মা।

তুমি ছেড়েছো তবে তিতাসের পাড়, ভুলেছো তার স্বর

তিতাস তোমায় রেখেছে মনে তার প্রতি আর্তনাদে।

তিতাসের মেয়ে মিস দেবনাথ,

তুমি ফিরবে কি তিতাসের কোলে একবার?


নব প্রবাদ

মোহাম্মদ আবদুর রহমান


হাসনা তোমার হৃদয়ের কিউ আর কোড নিয়মিত স্ক্যান করতে থাকি

রক্তের ও গ্রুপ হয়ে নিংড়ে দিতে থাকি অসীম প্রেম

চেক করে দ্যাখো তোমার হৃদয়ের অ্যাকাউন্ড।


বন্ধন সৃষ্টির সময় ফেবিকুইক দিয়ে জুড়ে দিয়েছিলাম দুটি অন্তঃকরণ

আমি পৃথিবীর মত ঘুরতে থাকি হৃদে জেগে থাকা জ্যোতিষ্কের চারিদিকে।

জোনাকি হলেও অন্ধকার হতে দিইনি জীবনের পাঠশালা

প্রাণদ্বয় মিশে তৈরি হয়েছে একটি নব যৌগিক পদার্থ

গগন বক্ষে উড়বে নব প্রবাদ


মৃত্যু প্রহর 

এম সোলায়মান জয় 


কিছু মানুষ বা কিছু শহরের মরে যাওয়া উচিত

পুনরায় বেঁচে থাকবে কিংবা অন্ধকারে আসক্ত হবার জন্য

অনুভূতি নিঃস্ব হয়ে গেলে কুয়াশাচ্ছন্ন হয় রাজার প্রাসাদ

কোথায় যাচ্ছো? এমন প্রশ্ন করার অধিকার হারিয়ে যায়

যখন তুমি চলে যাও সাথে করে নিয়ে যাও নিজের আলো

ছায়া চলে গেলে আলোর প্রয়োজন থাকে না শরীরের

মায়া মরে গেলে কোন অন্তরের প্রয়োজন থাকে না

বন্যার শেষে ভেলার মতো যেন সবকিছু অযথা হয়ে যায়

পরাজিত রাজার মতো সময় তখন মৃত্যুর প্রহর গুনে।



তোমার হোক

আব্দুল্লাহ আল আম্মার

[উৎসর্গ : আমার বড় খালা]


এই পুষ্প বৃক্ষের ফাঁক গলে আসা রূপোলি চাঁদের কিরণে, 

সান্ত¡না খুঁজে পাইনি

অজস্র নিহারের এ সজীবতার মাঝে আমার চির পরায়ণ, 

তবু সান্ত¡না খুঁজে পাইনি


দুঃসাধ্যকে মেনে নেয়ার পৃথিবীতে কভু অবগাহনের তুষানলে পুড়ে ছাই 

মায়াবদ্ধ হৃদয়েরও সীমাবদ্ধতা আছে টের পেয়ে অস্তিত্ব হারাই, 

নিঠুর বাস্তবতাকে মানতে না পারা দুফোঁটা অশ্রুর স্রোতে 


ব্যর্থ মন রথে তবুও রয়ে যাওয়া 

দূর থেকে বহুদূর 


স্বপ্ন বয়ে আনা অজস্র নিহারের মাঝে এই সুখটুকু 

আমার না হোক, 

তোমার হোক 

এই ঘুমন্ত শহরের নিঝুম রাত্রির জেগে থাকা শোভান্বিত তারাগুলোর শোভাটুকুও 

তোমার হোক 

সুবাসিত এই পুষ্পবাটিকার নিষ্পাপ পাপড়িগুলো, 

তোমার পরে উৎসর্গিত হোক 

সুবাসটুকু তোমার হোক 

তোমার হোক। 




শুভ্র মেঘের মানুষ

গাজী তৌহিদ


কখনো কখনো হাতের মুঠ খুলে-

সবকিছু ছেড়ে দিতে হয়,

যে যাওয়া সে তো যাবেই।

শরতের শুভ্র মেঘের মতো,

গভীর সমুদ্রে আশা জাগানিয়া জাহাজের মতো,

টুপ করে ডুবে যাক,

নিমিষে মিলিয়ে যাক,

খোঁজ নেওয়ার দরকার নেই;

বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়ে আপন মানুষ ডেকে আনা যায় না।

দাঁতে দাঁত চেপে ভুলে থাকা শিখতে হয়,

গ্রানাইট পাথরের মতো,

কিউ কার্বন পদার্থের মতো,

হৃদয়টা শক্ত করে মানতে হয়-

হাতের মুঠ খুললে স্বাধীন হওয়া মানুষ,

অজুহাতে শরৎ শুভ্র মেঘে মিলিয়ে যাওয়া মানুষ,

কখনো আপন মানুষ হয় না।



পানির অভাবে রক্ত খাবে

হিলারী হিটলার আভী 


পানির অভাবে রক্ত খাবে 

এটা একদিন কবিতার লাইন হবে!


খাদ্যের অভাবে মানুষ মানুষকে কামড়ে খাবে 

এটাও একদিন কবিতার লাইন হবে! 


স্বার্থের মোহে নীতির বিসর্জন দিবে 

এটাও একদিন কবিতার লাইন হবে!


‘একজনও ভালো মানুষ নেই’

এটাও কেয়ামতের আগে কবিতার বাস্তব লাইন হবে! 


সব যান্ত্রিক কল’ই একদিন বিকল হবে 

এটা আজ থেকেই আমার কবিতার লাইন হলো!



নিঃসঙ্গ, বড় একা

আহমদ সাইফ 


দিনশেষে নীড়ে ফেরা পাখি একাকিত্ব বোঝে না!

সারি সারি বৃক্ষকেও একাকিত্ব পায় না।

লক্ষ কোটি নদীর ঢেউ কখনো একা হয় না,

পাহাড়ের সীমাহীন উচ্চতা আকাশ ছুঁতে চায় ;

মরুভূমির ধূ-ধূ বালু অসীম দৃষ্টিকে ছাড়িয়ে যায়! 

গাঁয়ের মেঠোপথ সাপের মতো এঁকে বেঁকে হেঁটে যায়।

মাঠের আলে জন্মানো দূর্বাঘাসও দলছুট হয় না!


শুধু-

মানুষ নিঃসঙ্গ-নিরবতায়-একাকিত্বে যাপন করে শতাব্দীর পরিসংখ্যান! 


দিনশেষে মানুষ ফেরারি আসামীর মতো নিঃসঙ্গ, বড় একা!



দূরত্ব 

ইয়াসিন আরাফাত


বিস্তৃীর্ণ মরুভূমির বুকে

খা খা রোদ্দুরে

যাযাবর বাতাসের পাঁকে 


ক্লান্ত পথিক

তৃষ্ণার্ত পথিক

ভুল করে পথ হারালে-


সে জানে

নির্মম দূরত্ব কাকে বলে!




গণতান্ত্রিক প্রেম

ফাহাদ আজিজ


আমাদের প্রেমটা হয়েছিল গণতান্ত্রিক নিয়মে;

যেখানে তুমি ছিলে একজন চতুর নেতা, আর-

আমি ছিলাম রাজনীতিতে ব-কলম, সহজ-সরল

সামান্য এক ভোটার। তুমিই তো স্বপ্ন দেখিয়েছিলে না?

কিন্তু আমিতো বুঝি নি;

গণতন্ত্রের সবকিছুই মিথ্যা। 

এখানে আশ্বাসকে বিশ্বাসে পরিনত করার কোনো নীতি নেই। 


তবে এখন বুঝি;

গণতন্ত্র কেবল স্বপ্নই দেখাতে পারে 

স্বপ্ন পূরণের সাধ্য গণতন্ত্রের নেই।


যাকাত হোক সুন্দর এবং সুন্দরতম

যাকাত হোক সুন্দর এবং সুন্দরতম

 


যাকাত হোক 

সুন্দর এবং সুন্দরতম 

হাসিসা সুরমা  

      

 মহান আল্লাহ পাক তার ইবাদতের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর আনুগত্য, আদেশ মেনে চলা এবং নিষেধ থেকে দুরে থাকার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ প্রিয় থেকে আরো প্রিয় হয়ে উঠে। মহান রব  ইরশাদ করেছেন,”আমি তার প্রাণশিরা অপেক্ষা অধিক নিকটে আছি” (সুরা কাফ : ১৬)। আর ইবাদত শারিরীক এবং আর্থিক দু’ধরনের হয়ে থাকে। যাকাত হল আর্থিক ইবাদত, যা সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে বান্দা মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। যাকাত গরীব দুঃখীদের হক বা পাওনা। যা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে গরীবদের প্রতি ধনীদের জন্য অর্পিত দায়িত্ব। মুসলিম জাতির জন্য এক বিশাল নেয়ামত, যা গরিবের অভাব মোচন এবং ধনীদের সম্পদ বাড়িয়ে দিতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করে। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, “হে বিশ্বাসীরা! তোমাদের আমি যা দিয়েছি তা থেকে দান করো সেই দিন আসার আগে, যেদিন কোনো রকম বেচাকেনা, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ থাকবে না” (সুরা বাকারা: ২৫৪)। 

 যাকাত কখন কিভাবে ফরজ হয় এসব বিষয়ে সকলে অবগত হলেও যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু অবহেলা বা অসাবধানতার কারনে এই বিশাল নেয়ামত থেকে পিছিয়ে পড়ছে মুসলিম সমাজ। দেখা যায়, যাকাত দেয়া হয় লোক দেখানো, সোস্যাল মিডিয়ায় নিজের প্রচার প্রচারণা, যশ খ্যাতি ইত্যাদি লাভের আশায়, যা খুবই নিন্দনীয় এবং গর্হিত কাজ। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, “হে বিশ্বাসীরা! তোমরা দানের কথা প্রচার করে এবং (দান গ্রহণকারীকে) কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বরবাদ করে দিয়ো না, ঠিক ঐ লোকের মতো যে শুধু লোক দেখানোর উদ্দেশ্যেই দান করে।“ (সুরা বাকারা: ২৬৪)

যাকাত মুসলিম জাতির জন্য মহান রবের নির্দেশ। যাকাত দিতে হবে এমন পন্য যা (কাপড় হওয়া শর্ত নয়) আপনি নিজের জন্য পছন্দ করবেন। যাকাত দিতে কার্পন্য একজন  মুসলিম মুমিনের জন্য কোনভাবে সমীচিন নয়। যাকাত আদায়কারীর এমন মনে করা উচিত নয় যে আমার অর্জিত সম্পদ থেকে তাকে দান করছি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা যা কিছু দান করো তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করো, আর যা কিছু তোমরা দান করো, তার পুরস্কার পুরোপুরি প্রদান করা হবে।’ -(সুরা বাকারা : ২৭২)

যাকাত হচ্ছে একজন গ্রহীতার অধিকার বা পাওনা। যা কখনোই দাতার অংশ হতে পারে না। সুতরাং যাকাত দিতে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, আপনি যা দিচ্ছেন তা যেন গ্রহীতার কাজে আসে অথবা এমন কিছু দেয়া উচিত যা তার খুব প্রয়োজন। যাকাত মানেই অল্প দামের শাড়ি বা লুংগি নয়। দুঃখের সাথে বলতে হয় মার্কেটে আলাদা করে নিম্নমানের কিছু কাপড় দেখা যায় যেগুলো যাকাতের জন্য নির্ধারিত।  যেই কাপড়গুলো কেউই কিনে না, মানে খারাপ কিন্তু দামে সস্তা। এগুলো একসাথে ১০/২০/৩০ জনের জন্য যাকাত দেয়ার উদ্দেশ্যে কেনা হয়, যা কয়েক ধোয়াতে আর ব্যবহারের উপযোগী থাকে না। এক্ষেত্রে গ্রহীতার কোন লাভ না হলেও দাতা তার পরিবার, সমাজ, সোস্যাল মিডিয়ার গর্বের সাথে বলতে পারে ৩০ জনকে যাকাত দিয়েছি। এমন দানের শিক্ষা ইসলাম আমাদের দেয় নি। নবী করীম (সা.) বলেছেন, “কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তিন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন না। তাদের মধ্যে একজন হলো, (দান করে) অনুগ্রহ প্রকাশকারী ব্যক্তি।“-(মুসলিম: ১০৬)

যাকাত দেয়া মানে দাতার দানে গ্রহীতা আনন্দিত হওয়া। যাকাত হতে পারে ১০টি পরিবারকে নির্দিষ্ট কিছু টাকা দেয়া, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বাজার করে দেয়া, একবেলা খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়া ইত্যাদি। যাকাত একজন মুসলিম ভাই থেকে অন্য ভাইয়ের প্রাপ্য।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় নিজের আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব যারা অভাবী, তাদের বাদ দিয়ে এমন জায়গায় দেয়া হয় যেখানে দিলে নিজের প্রচারণা বাড়বে, মানুষ জানতে পারবে, লোকজন বাহবা দিবে, নামের আগে কয়েকটি উপাধির সংযোজন হবে। এমন লোকের যাকাত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে কখনোই কবুল হবে না। যাকাত দেয়ার ক্ষেত্রে নিজের কাছের মানুষ, আশেপাশের মানুষ অগ্রাধিকার পাবে। সুন্দর হোক মানুষগুলো, সুন্দর থাকুক পৃথিবী।


প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ। 

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্রগ্রাম।


পদাবলি

পদাবলি

 



কুকুর ও বিবর্তনমুখী রাষ্ট্র

দ্বীপ সরকার


কুকুরগুলো ইদানিং সরছেনা-

নাকের ডগায় হেসে ভেসে দিচ্ছে ঘেউ ঘেউ

উঠোনে কার যেন পা পড়েছে আজ

পীতরঙা মেঘের ভেতর কে হেঁটে বেড়ায়


কোমলমতি রোদের মাহফিলে কে এসেছে? 

কে কন্ঠ মিলিয়ে কুকুরের সাথে রাষ্ট্রের গান গায়?


আমাদের এইখানে-এই রাষ্ট্রে

মজার এটা ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে 

কুকুরগুলো গা ঘেঁষে বসে সামাজিক হতে চায়

আমারা সুযোগ দিচ্ছি কিংবা দিচ্ছি না

অথচ কুকুরের মুখে লালার বদলে

বির্বতনের জল গড়িয়ে পড়ছে

খুব চিকচিকে এবং ফিকফিকে



জন্মের দাগ

সাব্বির আহমাদ 


অযাচিত প্রশ্নের সম্মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি।

আকাশচুম্বী উপত্যকা ঘেঁষে 

গলে গলে পড়ছে সহস্র বছর পুরনো আলোকবর্ষের দোষ। 

জন্মের দাগ রেখে পালিয়ে যাচ্ছে বছর।

ঐ পথে মায়েদের চোখের ভিতর 

জমা হচ্ছে বিষাক্ত ছোবলের আঘাত।  

সময়ের কোলে বসে অকাতরে কাতরাচ্ছে 

আহত চিৎকার-

আমাদের বঞ্চিত সব অধিকার। 

এরপর ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আছে;

রাতের নির্জনতা গাঢ় হতে হতে 

নিস্তব্ধ হয়ে যায়ে কুহকের বুক।



একটি পণ্যবীথির আত্মকাহিনি 

সোহেল রানা 


পুবের হাওয়া যেন গায়ে মাখানো সাবান!

এ-ই চায়ের নেশা আর আড্ডাবাজি’ই সকল নষ্টের গোড়া! 

আর ওটা যখন তোমার পেয়ে বসেছে- তুমি শেষ-

দাদা বলতেন।


এখানে শুধু নুন-তেল-সামগ্রীর অভাব পূরণেই নয়, 

বরং রাজনীতি, অর্থনীতি ও 

দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদনের যথার্থ স্থান


খলিল-মকবুলের চায়ের কাপে ঝড়-

দারোগালীর জয়জয়কার!

শুনেছি যাত্রাশিল্পী-নোলে ঘোষের সাথে 

দাদারও দহরমমহরম ছিল খুব বেশি!

আর বাবা পরবর্তীকাল আমি... 

যার ধারাবাহিকতা অনন্তকাল চলবে।


পুবের সূর্য পশ্চিমে ডুবো তারপর রাত ঘনায়-

অন্ধকারে পিষ্ট পথচারী- একটা হায়েনার হাসি! 


এবং সাপের ছোবলে বাজপাখির মৃত্যু! 

যদিও অজগরটা এখনো হাঁ-করে আছে।


চাপা বিপ্লব

আকিব শিকদার


আধপোড়া সিগারেটে পুনরায় জ্বালাই আগুন, কাচফাটা চশমাটা 

নাকের ডগায়, মুখময় বার্ধক্যের জ্যামিতিক রেখা। 

কানের গোড়ায় সাদা চুল জানিয়ে দেয় বয়স। আমি যেনো 

নিবিড় গুহায় নিদ্রিত বুড়ো সিংহ, পড়ে আছি অসহায়। 

তবু অনাচার দেখলেই জ্বলে ওঠে গা, মনে হয় 

শরীরময় এসিড, জামার ভেতর কেউ ছেড়েছে মুঠো ভরা বিষপিঁপড়ে।


নক্ষত্র খসে পড়লে আকাশের খুব বেদনা হয়। আমাদের 

বেদনা হয় যখন স্বপ্নগুলো বালির বাঁধের মতো গড়িয়ে যায়।

যখন আশার শ্যামল ডগা নেতিয়ে পড়ে, বইয়ের পাতার ভাঁজে 

গোলাপ-পাপড়ির মতো শুকিয়ে হয় কাঠ। 

যখন আমাদের বালিশ-তলায় চাবির গোছার মতো 

যতেœ আগলে রাখা সন্তানেরা 

হয়ে যায় হায়েনার শিকার। আমাদের খুব বেদনা হয়... 


চলার পথে শত্রুরা ছড়িয়ে রাখে কাঁটা, উটকো পাথর। 

ওরা তো জানে, জল ঘোলা করলেই

মাছেরা পড়বে বিপাকে; হঠাৎ আলো নিভে গেলে 

যেমন বিপাকে পড়ে পতঙ্গ।

শকুনের চোখ আর ঠোঁটের আঘাতে মুমূর্ষ জীবন, বরফে জাহাজ 

এঁটে যাওয়ার মতো স্তম্বিত জীবনের সাবলীল গতি।

যেন কাশের গভীর অরণ্যে বালিহাঁসের

রক্তস্রোত বইয়ে দিলো একটা শিয়াল। 

এক ফোঁটা স্নিগ্ধ শিশিরের জন্য, একটা ফুটন্ত গোলাপের জন্য 

আমাদের চোখে অশ্রু। যেন আমরা কাচের বৈয়ামবদ্ধ তেলাপোকা

নিঃশ্বাসের যন্ত্রণায় ধুঁকছি ভীষণ। 


কাল-গোখরার বিক্ষুব্ধ তা-বে ফুঁসে উঠবই একদিন, প্রতিবাদে 

মারবো ছোবল। রক্ত জবার মতো লাল চোখ, রক্তিম দৃষ্টিতে 

ঝরিয়ে আগুনের ফুলকি জ্বালাবোই সত্য আলোর শিখা। 

মানবো না বেআইনি আইন। যতক্ষণ বাঁচি

চলবো তেজোদ্দীপ্ত ভঙ্গিমায়, যদি মৃত্যু আসে 

করবো আলিঙ্গন মরণেরে অগ্নিমুখ পতঙ্গের মতো। 

ঝাপসা পৃথিবী দেখতে চাই না আর, ছুঁড়ে ফেলে 

ভাঙা চশমা, মুখ থেকে টেনে তুলে বার্ধক্যের ছাপ 

পায়ের তলায় চাপা দিয়ে জ্বলন্ত সিগারেট, কালো ধোঁয়ার 

কু-লি ভেদ করে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে করে আমার।


লেবাস

রফিকুল নাজিম 


বাজারে সাদা রঙের পোশাকের চাহিদা বেড়েছে খুব

সুই-সুতার ঘরে কারিগরদের ব্যস্ততাও বেড়েছে খুব।


সাদা পাঞ্জাবিতে পাতি লিডারকে 

মনে হয় পূতপবিত্র মানুষ; সাক্ষাত দেবদূত,

সাদা পাঞ্জাবিতে খলনায়ককেও 

মহানায়ক উত্তম কুমারের মতো লাগে!

সাদাতে ফটকাবাজ আদম ব্যবসায়ী 

সুরত আলীকেও মনে হয়- উদীয়মান সমাজসেবক।

সাদা মানেই পবিত্রতার প্রতীক; সাদা এখন হালের ফ্যাশন।


চতুর্দিকে সাদা পোশাক পরা লাখো মানুষকে দেখি রোজ

আহা! সাদা মনের মানুষগুলো কোথায় যেন হচ্ছে নিখোঁজ।


বদলে যাওয়া সময়ের গান

প্রিন্স মাহমুদ হাসান 


আমরা বদলাতে না চাইলেও বদলে যায় 

আমাদের হিসেব, বদলে যায় সময়।

শৈশবে যে বৃষ্টিকে দেখে ভিজতে যেতাম

আজ সে বৃষ্টিকে দেখে দৌড়ে পালাই।

আশ্রয় খুঁজি অন্তত একটি ছাতার কাছেও

আমরা ভেতর থেকে যতই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই

নিজের কাছে মিথ্যাবাদী সাজি ততই।

আমরা যারা আমাদের খেলনাপাতি গুছিয়ে

বড়দের আকার ধারণ করে আছি

তারা আজ সত্যিই কত বড় অসহায়!

আমাদের প্রকৃত কোন আশ্রয় নেই

নেই চিরচেনা পরিবেশের আবহ

আঁধারে পথ চেনার দায়িত্ব নিজের 

ঘাড়ে নিয়ে দিগি¦দিক ছুটে চলেছি।

আমাদের কান্না পেলে কাঁদতে পারি না

আমাদের ভেতরের কান্না বরফ হয়ে গেছে।



আমি কালো গোলাপ

মারজানা মার্জিয়া


আমি ঝড়ো হাওয়ার মত বেগবান,

আমি কাঠফাটা আগুন ,

বিরোধী আমি শরতের স্নিগ্ধ শুভ্র মেঘ হতে।

যে মেঘ ছায়ায় স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলবে ।

সকল ক্লান্তি-শ্রান্তি অস্থিরতা মুছে যাবে

আমি আগুন ঝরা ফাগুনে তোমায় পোড়াতে রাজি,

আমি রয়েছি বসন্তের দখিনা হাওয়ায়,

মৃদু মহনায় দুজনে হারিয়ে যাওয়ার বাঁধা হতে।

আমি কালো গোলাপ, আমি একগুচ্ছ লাল গোলাপের চির বিরোধিতা করেছি।

যার সুবাস নিসৃত হয়ে দুটি হৃদয় এক হয়; আমি তার মহাশত্রু হয়েছি।

চেয়েছি ঝিরি ঝিরি বাতাসে বয়ে যাওয়া

শাপলা ফোঁটা পুকুরের জলের বাধা হতে,

যার ¯্রােতধারায় মিশে মিলিত হয়,

দুটি হৃদয়ের উষ্ণতা উত্তাল তরঙ্গে।

আমি কালো গোলাপ- 

বিরোধীতা করেছি লালগোলাপ সামনে রাখা তোমার প্রেমালাপ।

আমি কালো গোলাপ-

ক্লান্তিকালের হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া, বিলুপ্তপ্রায় সংলাপ।

আমি প্রণয় জীবনের বিদ্ধস্ত বিপর্যস্ত বিক্ষিপ্ত আর মহাশান্তির সংঘর্ষণ।

যত সুন্দরই হোক তোমার প্রাপ্তি, 

ঠিক তার চেয়ে বিধ্বংসের ন্যায় ঘটাবো প্রণয় জীবনের সমাপ্তি।

আমি কালো গোলাপ -

পারিনি লালের সৌরভতা ছড়াতে, 

শিখেছি রক্ত লালে তোমার হৃদপিন্ড ক্ষতবিক্ষত করতে।

আমি অবহেলিত অপ্রিয়, ভীড়ের মাঝের বিরলমাখা কালো গোলাপ হয়ে জন্মেছি।

প্রণয়ের মহাভয় হয়ে দাড়িয়েছি, সুশ্রী মিলনে চিরবাধা হতে চেয়েছি ।



কিশোরীর তরে প্রেম 

মীযান তাসনীম


তোমাকে বলি নি কিছু 

কত কথা ছিলো 

সময়ের এই স্রোত 

সব শুষে নিলো। 


ভালো লাগা ছিলো আর

ছিলো কী যে টান

তোমাকে ভেবেই দিল

হতো পেরেশান।


দেখা দিলে মনে হতো

এইটুকু ক্ষণ

বুকে ধরে কেটে যাক

পুরোটা জীবন! 


যতটুকু প্রেম ছিলো 

বেশি ছিলো ভয়

কিশোরীর তরে প্রেম

এমনই কি হয়?



সূর্যমূখি গান 

রজব বকশী 


এই জীবনের রাস্তা খুঁড়াখুঁড়ির শেষ নেই  

যেভাবে নির্মাণ এগিয়ে যায়

আমাদের অনাগত ভবিৎষতের দিকে 

ভোর গড়িয়ে সকালের পথ ধরে 

দুপুরের প্রান্তরে জাঁক জমক উপস্থিতি 

আহা দুপুরমিত্র! এই জীবনের সোনালি সময়

ফুরালে কেবলি স্মৃতি ও দীর্ঘশ্বাস উঁকি দেয়

হায়! ক্লান্ত বিবর্ণ বিকেল ছায়া ফেলে যায় 

দীর্ঘশ্বাসে সন্ধ্যার স্তব্ধতা কুড়াই 

একাকিত্বের বিষণণ অক্টোপাস নীলক›ঠ ঢেউ 

যথারীতি রাতের গভীরতা স্পর্শ করে

যদিও গন্তব্য উজ্জ্বল ভোরের দিকে

শব্দ ও নৈঃশব্দের যাত্রী হয়ে জেগে উঠি

এই শরীর মনের অভিব্যক্তি প্রস্ফুটিত করে

নিশ্বাসে ছড়াই হৃদ্যতার পারফিউম 

চৈতন্যোদয়ে বাড়াই হাত 

সূর্যমুখি গান



কবিতা আমার

হাফিজুর রহমান


আমি চাই, আমার কবিতাগুলো বেঁচে থাক;

কথা বলুক ন্যায়ের পক্ষে- অন্যায়ের বিরুদ্ধে 

একইভাবে শত-শতাব্দীর পরে শতাব্দী ধরে। 


ব্যস্ততম সড়ক ছেড়ে খানিকটা সময়ের জন্য 

ঘুরে দাঁড়িয়ে শুনে ভাববে হয়তো কোন পথিক, 

অল্পের হলেও এ যেন হয় তারই জীবনের গল্প।

অশ্রু সজল ধর্ষিতার চোখে কবিতা প্রলয়ে

হতে পারে অন্ত্যমিলের গোলযোগ ভীষণ!

তাতে কী? অনিয়মের বিরুদ্ধাচারণে বর্ণগুলো,

ঝাঁঝালো ভাষায় মিছিল করবে এক-জোট হয়ে

একেকটি শব্দ- প্রতিস্থাপন করার তীব্র বাসনায়

মনুষ্যত্বের, অচল যন্ত্রগুলোকে সচল করতে।


আমি চাই, আমার প্রিয় কবিতাগুলো বেঁচে থাক;

অনন্ত সময় ধরে- মেয়াদোত্তীর্ণের ধার না ধেরে।


ঈদসংখ্যা : ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ২১১

ঈদসংখ্যা : ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ২১১

    তারুণ্যের শিল্প সরোবর ।। বর্ষ ৮ম ।। সংখ্যা ২১১,

    শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪,০৬ বৈশাখ ১৪৩১, ০৯ শাওয়াল ১৪৪৫।